গরুর মাংসের কালা ভুনা

কড়াই থেকে ভেসে আসা সেই চেনা সুবাস, মাংসের গায়ে লেপ্টে থাকা ঘন কালচে মসলা আর জিভে জল আনা স্বাদ— চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের কালা ভুনা মানেই তো ভোজনরসিক বাঙালির কাছে এক মহা উৎসব। ঘরে এই চমৎকার পদটি রেঁধে নিতে আপনার মোট ১২০ মিনিট সময় লাগবে, যার মধ্যে প্রস্তুতিতেই কাটবে ৩০ মিনিট আর চুলায় ধিমে আঁচে রান্না হতে লাগবে ৯০ মিনিট। কোরবানি ঈদ কিংবা যেকোনো পারিবারিক পার্বণে এই পদের কদরই আলাদা। মেঘলা দিনে বা শীতের অলস দুপুরে গরম ধোঁয়া ওঠা চালের রুটি কিংবা সুগন্ধি পোলাওয়ের সাথে যখন প্লেটে এই মাংস পড়ে, তখন যেন আর কিছুই লাগে can না। মনে পড়ে ছোটবেলায় নানুবাড়ির সেই দিনগুলোর কথা; উঠোনের কোণে মাটির চুলায় নানি যখন কাঠের আঁচে বড় ডেকচিতে মাংস কষাতেন, খাঁটি সরিষার তেল আর মসলার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত পুরো পাড়াময়। সেই সুবাসটাই তো এই রান্নার আসল প্রাণ! তাড়াহুড়ো করে রান্না করলে কিন্তু এর আসল স্বাদটাই মাটি হয়ে যাবে।

অনেকেই ভাবেন, চট্টগ্রামের খাঁটি গরুর মাংসের কালা ভুনা বুঝি কেবল বড় কোনো বাবুর্চি বা রেস্তোরাঁর শেফদের পক্ষেই বানানো সম্ভব। রান্নাটি বেশ সময়সাপেক্ষ মনে হলেও আসলে কিন্তু তা নয়। সঠিক মাপজোখ আর রান্নার সঠিক কৌশল জানা থাকলে আপনিও নিজের রান্নাঘরেই বাজিমাত করতে পারেন। কোনো কৃত্রিম রঙ ছাড়া কীভাবে মাংসের সেই খাঁটি কালো রঙ আর মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়া নরম ভাব আনা যায়, আজ সেই সহজ ঘরোয়া কৌশলটাই আপনাদের সাথে ভাগ করে নেব। একবার চটজলদি দেখে নিলেই বুঝতে পারবেন, রান্নাটা আসলে কতটা সহজ আর মজার। মাংসের এই পদের পাশাপাশি যদি মাছের কোনো ঐতিহ্যবাহী স্বাদ চেখে দেখতে মন চায়, তবে আমাদের এই দারুণ কই মাছের ঝোল রেসিপি: বাঙালির ঐতিহ্যবাহী স্বাদ লেখাটি দেখে নিতে পারেন।

গরুর মাংসের কালা ভুনা
ছবি ১: চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের সুস্বাদু কালা ভুনা

হাতে কতটা সময় নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকবেন, সেই হিসাবটা আগেভাগে সেরে নিলে কাজটা কিন্তু অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই রান্না শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সময় ও পরিবেশনের একটি ছোট্ট ধারণা নিচে ছক আকারে তুলে ধরলাম:

পরিবেশন সংখ্যাপ্রস্তুতি সময়রান্নার সময়কঠিনতার মাত্রা
৬ জন৩০ মিনিট৯০ মিনিটমাঝারি

সেরা গরুর মাংসের কালা ভুনা তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ

এই রান্নার মূল ম্যাজিক কিন্তু লুকিয়ে আছে মসলার নিখুঁত অনুপাতে। কোনো কৃত্রিম রঙ ছাড়াই মাংসের গাঢ় কালচে রূপটি আসে ধাপে ধাপে কষানোর কৌশলে। বাজারে কেনা রেডিমেড মসলার চেয়ে ঘরে জোগাড় করা তাজা মসলার ঘ্রাণই কিন্তু পদের স্বাদ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই চেষ্টা করবেন প্রতিটি উপকরণের মাপ ঠিকঠাক রাখতে। চলুন, রান্নাঘরে ঢোকার আগে উপকরণগুলো একবার মিলিয়ে নিই:

  • ১.৫ কেজি — গরুর মাংস (হাড় ও চর্বিসহ ছোট টুকরো করা)
  • ২ কাপ — পেঁয়াজ কুচি
  • ১ কাপ — পেঁয়াজ বেরেস্তা
  • ২ টেবিল চামচ — আদা বাটা
  • ১.৫ টেবিল চামচ — রসুন বাটা
  • ১ চা চামচ — হলুদ গুঁড়ো
  • ২ টেবিল চামচ — লাল মরিচ গুঁড়ো
  • ১ টেবিল চামচ — ধনে গুঁড়ো
  • ১ টেবিল চামচ — জিরে গুঁড়ো
  • ১ টেবিল চামচ — গরম মসলা গুঁড়ো
  • ১/২ চা চামচ — জায়ফল-জয়ত্রী গুঁড়ো
  • ১ চা চামচ — কালো গোলমরিচ গুঁড়ো
  • ১ কাপ (রান্নার জন্য) + ১/৪ কাপ (বাগাড়ের জন্য) — সরিষার তেল
  • ৪ টেবিল চামচ — টক দই
  • ৩টি — তেজপাতা
  • ৩ টুকরো ও ৫টি — দারুচিনি ও এলাচ
  • ১ চা চামচ — রাঁধুনি মসলা গুঁড়ো (বিশেষ মসলা)
  • ২ টেবিল চামচ — রসুন কুচি (বাগাড়ের জন্য)
  • ৪-৫টি — শুকনো মরিচ (বাগাড়ের জন্য)
  • স্বাদমতো — লবণ

গরুর মাংসের কালা ভুনা রান্নার ধাপে ধাপে সহজ পদ্ধতি

সবকিছু হাতের কাছে গুছিয়ে নিয়েছেন তো? এবার তবে আসল রান্নায় নামা যাক। গরুর মাংসের কালা ভুনা রান্নার আসল ট্রিক হলো তাড়াহুড়ো না করে একটু ধৈর্য ধরা। মাংসের ভেতরের রসালো ভাবটা বজায় রেখে বাইরে সেই কালচে আভা আনতে চাইলে কয়েকটি সহজ ধাপ একটু মন দিয়ে অনুসরণ করতে হবে। চলুন, রান্নাটা শুরু করা যাক:

  1. ধাপ ১: মাংস মাখানো ও প্রস্তুতি — শুরুতেই মাংস ভালো করে ধুয়ে জল একদম নিংড়ে ঝরিয়ে নিন। জল থেকে গেলে কিন্তু মসলা মাংসের ভেতরে ঠিকমতো ঢুকবে না। এবার ছড়ানো একটি পাত্রে মাংস নিয়ে তাতে পেঁয়াজ কুচি, বেরেস্তা, আদা-রসুন বাটা, সব গুঁড়ো মসলা (হলুদ, মরিচ, ধনে, জিরে, গরম মসলা এবং জায়ফল-জয়ত্রী), ফেটানো টক দই, পরিমাণমতো লবণ ও এক কাপ খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে দিন। চামচ দিয়ে নয়, হাত দিয়ে সময় নিয়ে মাংসটা খুব ভালো করে মেখে নিন। হাতের ছোঁয়াতেই রান্নার অর্ধেক স্বাদ আর ভালোবাসা মিশে যায়। প্রতিটি টুকরোয় যেন মসলা সমানভাবে লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
  2. ধাপ ২: ম্যারিনেশন বা বিশ্রাম — মসলা মাখানো মাংসের পাত্রটি ঢেকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় অন্তত ৩০ মিনিটের জন্য রেখে দিন। হাতে সময় বেশি থাকলে ফ্রিজের নরমাল চেম্বারে ২-৩ ঘণ্টাও রাখতে পারেন। এই বিশ্রামের ফলে মাংসের আঁশগুলো নরম হয়ে উঠবে এবং মসলার স্বাদ একেবারে হাড়ের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যাতে রান্নার পর মাংস ভেতর থেকে রসালো থাকে।
  3. ধাপ ৩: চুলায় বসানো — এবার মাঝারি আঁচে পাত্রটি চুলায় বসিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিন। একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, এই সময়ে কিন্তু ভুলেও বাড়তি জল দেবেন না। কিছুক্ষণ পরেই দেখবেন মাংস থেকে নিজে থেকেই বেশ খানিকটা জল বের হতে শুরু করেছে। এই জলেই মাংস নরম হবে এবং তার নিজস্ব চর্বি গলে গিয়ে তরকারিতে চমৎকার একটা স্বাদ আনবে।
  4. ধাপ ৪: কষানো ও জল শুকানো — মাঝারি আঁচে মাংসটা ঢেকে প্রায় ৪০-৫০ মিনিট রান্না হতে দিন। মাঝে মাঝে ঢাকনা খুলে তলা থেকে ভালো করে নেড়ে দিতে হবে, নয়তো নিচে লেগে গিয়ে পোড়া গন্ধ ছড়াতে পারে। যেহেতু বাড়তি কোনো জল নেই, তাই এই কষানোর সময়টুকুতে একটু নজর রাখতে হবে। মাংসের জল যখন পুরোপুরি শুকিয়ে ওপর লালচে তেল ভেসে উঠবে, তখন চুলার আঁচ একদম কমিয়ে দিন।
গরুর মাংসের কালা ভুনা
ছবি ২: মৃদু আঁচে কষানো হচ্ছে কালা ভুনার সুস্বাদু মাংস
  1. ধাপ ৫: ঐতিহ্যবাহী বাগাড়ের প্রস্তুতি — কালা ভুনার আসল ম্যাজিক কিন্তু এই বাগাড়েই! এবার অন্য একটি ছোট কড়াইয়ে বাগাড়ের জন্য রাখা ১/৪ কাপ সরিষার তেল গরম করে নিন। তেল ধোঁয়া ওঠা গরম হলে তাতে পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি ও শুকনো মরিচ ছেড়ে দিন। ধিমে আঁচে নেড়েচেড়ে এগুলোকে সুন্দর সোনালি করে ভেজে নিন। রসুন আর শুকনো মরিচ ভাজার যে মৌতাত সুবাস বেরোবে, তাতেই জিভে জল চলে আসবে।
  2. ধাপ ৬: বাগাড়ের মিলন — এবার ভাজা পেঁয়াজ-রসুনের এই গরম তেলের মিশ্রণটি সাবধানে মাংসের হাঁড়িতে ঢেলে দিন। সাথে সাথে খুন্তি দিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে মাংসের সাথে মিশিয়ে নিন। বাগাড় দেওয়ার পর মুহূর্তেই পুরো রান্নাঘর এক স্বর্গীয় সুবাসে ভরে উঠবে, যা খাওয়ার ইচ্ছেটাকে বহুণ বাড়িয়ে দেবে।
  3. ধাপ ৭: বিশেষ মসলার প্রয়োগ — এবার একদম কম আঁচে মাংসটি অনবরত নাড়তে হবে। এই সময়েই আমাদের সেই বিশেষ উপকরণ রাঁধুনি মসলা গুঁড়ো আর কালো গোলমরিচ গুঁড়ো ওপর থেকে ছড়িয়ে দিন। রান্নার শেষ সময়ে এই মসলাগুলো দিলে এদের কাঁচা ও তীব্র সুবাসটা মাংসের ছত্রে ছত্রে খুব সুন্দরভাবে মিশে যায়।
  4. ধাপ ৮: কালচে রঙ আনা ও সমাপ্তি — নাড়তে নাড়তেই দেখবেন মাংসের রঙ বদলে ধীরে ধীরে কালচে হতে শুরু করেছে। এই সময়ে হাত থামানো যাবে না, অনবরত নাড়তে হবে যাতে নিচে লেগে না যায়। একটা কথা মনে রাখবেন, পুড়ে কালচে করা আর কষিয়ে গাঢ় কালচে করার স্বাদ কিন্তু আকাশ আর পাতাল! মাংস যখন নরম হয়ে সুন্দর কালচে-লালচে রঙ নেবে এবং হাড় থেকে মাংস কিছুটা আলগা হয়ে আসবে, তখনই বুঝবেন আপনার গরুর মাংসের কালা ভুনা একদম তৈরি। এবার চুলা বন্ধ করে নামিয়ে নিন।

মাংসের এই রাজকীয় পদের পাশাপাশি যদি নিত্যদিনের সহজ ও ঘরোয়া আরও কিছু রান্নার হদিস পেতে চান, তবে আমাদের সব বাংলা রেসিপি পাতাটি থেকে ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে আপনাদের জন্য মনের মতো সব বাঙালি রান্নার সহজ উপায় বলা আছে।

গরুর মাংসের কালা ভুনা রান্নার কিছু দরকারি টিপস

চট্টগ্রামের সেই ঐতিহ্যবাহী স্বাদটি হুবহু ঘরে ফুটিয়ে তুলতে চাইলে ছোটখাটো কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা খুব জরুরি। অনেকবার রান্নার পর যে অভিজ্ঞতাটুকু হয়েছে, সেখান থেকেই কয়েকটি দরকারি কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি, যা রান্নার কাজটা আরও সহজ করে দেবে:

  • তেল নির্বাচনে ভুল করবেন না: এই রান্নায় কোনো অবস্থাতেই খাঁটি সরিষার তেল বাদ দেওয়া যাবে না। সয়াবিন তেল দিয়ে রাঁধলে কিন্তু কালা ভুনার সেই চেনা ঝাঁঝালো গন্ধ আর আসল স্বাদ কোনোভাবেই মিলবে না।
  • চুলার আঁচের দিকে নজর রাখুন: মাংস কালচে করার লোভে ভুলেও জোর আঁচে রান্না করবেন না বা পুড়িয়ে ফেলবেন না। ধিমে আঁচে ক্রমাগত নেড়েচেড়ে রঙটা আনতে হবে। বেশি কড়া করে ভাজলে মাংস শক্ত বা ছিবড়ে হয়ে যাবে, তখন আর চিবিয়ে খাওয়া যাবে না।
  • রাঁধুনি মসলাই আসল খেলোয়াড়: অনেকেই রান্নার রাঁধুনি ব্র্যান্ডের সাধারণ গরম মসলার প্যাকেটের সাথে এই মসলাটিকে গুলিয়ে ফেলেন। এখানে রাঁধুনি মসলা (Radhuni seed বা বুনো জোয়ান) হলো মূল ম্যাজিক মসলা, যা কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। এই মসলার ঘ্রাণই কালা ভুনাকে সাধারণ মাংসের ঝোল থেকে আলাদা করে তোলে।
  • লোহার কড়াইয়ের জাদু: হাতের কাছে যদি লোহার কড়াই থাকে, তবে রান্নার শেষদিকের কষানোর পর্বটা লোহার কড়াইয়ে করার চেষ্টা করুন। এতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই মাংসের সেই নিখুঁত কালো রঙটি খুব সহজে আর প্রাকৃতিকভাবে চলে আসে।

রান্নাটা চাইলে নিজের মতো করে একটু এদিক-ওদিকও করতে পারেন। যেমন, গরুর মাংসের পরিবর্তে চাইলে খাসির মাংস দিয়েও হুবহু একই পদ্ধতিতে কালা ভুনা রাঁধতে পারেন। যারা একটু বেশি ঝাল ভালোবাসেন, তারা বাগাড় দেওয়ার সময় কড়াইতে গোটাকয়েক কাঁচা মরিচের ফালি ফেলে দিতে পারেন। আর যদি কোনোদিন খুব কম সময়ে ঝটপট টেবিলে দারুণ কিছু পরিবেশন করতে চান, তবে আমাদের এই চমৎকার ডিম ভুনা রেসিপি: ঘরোয়া উপায়ে অতুলনীয় স্বাদের ডিম ভুনা দেখতে পারেন, যা দারুণ কাজে আসবে।

পরিবেশন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি

ঝামেলা তো মিটল, এবার মন ভরে খাওয়ার পালা! ধোঁয়া ওঠা গরম গরুর মাংসের কালা ভুনা সবচেয়ে ভালো জমে চালের আটার নরম রুটি, মচমচে পরোটা কিংবা ফুলকো লুচির সাথে। আবার সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের সাদা ভাত কিংবা ঝরঝরে পোলাওয়ের পাশে এই পদের জুড়ি মেলা ভার। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে পাতে এটি দিলে আর কোনো কথাই নেই। ভাতের পাতে আরও একটু বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে চাইলে সিলেটের বিখ্যাত সাতকরা দিয়ে রুই মাছের রেসিপি: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী স্বাদ রেসিপিটি ট্রাই করে দেখতে পারেন, উৎসবের আমেজ জমবে দারুণ।

গরুর মাংসের কালা ভুনা
ছবি ৩: উৎসবের আমেজে পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত গরুর মাংসের কালা ভুনা

অনেক সময় রান্না করা মাংস কিছুটা বেঁচে যায়, তা নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। কালা ভুনা ফ্রিজে তোলাও কিন্তু খুব সহজ। মাংস পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে গেলে একটি এয়ারটাইট বক্সে ভরে নরমাল ফ্রিজে রেখে দিন, ৩-৪ দিন অনায়াসে খাওয়া যাবে। আর যদি অনেকদিনের জন্য রাখতে চান, তবে ডিপ ফ্রিজে ভরে প্রায় মাসখানেক রেখে দেওয়া যায়। খাওয়ার আগে ফ্রিজ থেকে বের করে কড়াইয়ে সামান্য জলের ছিটে দিয়ে ধিমে আঁচে গরম করে নিলেই হবে; মাংসের সেই নরম ভাব আর সোঁদা স্বাদ আবার ফিরে আসবে। ওভেনে গরম করার চেয়ে চুলায় কড়াইতে ভাপিয়ে নেওয়াটাই কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ।

কালা ভুনার পুষ্টিগুণ

সুস্বাদু এই পদের পুষ্টিগুণ কিন্তু মন্দ নয়। গরুর মাংস আমাদের শরীরের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে দারুণ সাহায্য করে। এতে থাকা আয়রন, জিঙ্ক আর ভিটামিন বি-১২ শরীরের রক্তস্বল্পতা দূর করতে ও ইমিউনিটি বাড়াতে কাজে দেয়। তবে হ্যাঁ, কালা ভুনায় যেহেতু তেল একটু বেশি লাগে আর কষানোও হয় বেশিক্ষণ, তাই এটি কিন্তু বেশ ভারী ও চর্বিসমৃদ্ধ খাবার। যাঁরা ডায়েট করছেন কিংবা হার্টের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁরা একটু মেপে খেলে কোনো ক্ষতি নেই। আনন্দের দিনে এক-আধটু খাওয়া তো চলতেই পারে, শুধু খাওয়ার পাতে শসা বা লেবুর সালাদ একটু বেশি রাখবেন, হজমটা সহজ হয়ে যাবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. কালা ভুনার মাংস কি সত্যিই পুড়ে কালো করা হয়?

আরে না, একদমই নয়! এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। পুড়ে কালো করলে তো মাংস তিতকুটে হয়ে যাবে, যা খাওয়া যাবে না। এই সুন্দর গাঢ় কালো রঙটি আসে পেঁয়াজ বেরেস্তা, খাঁটি সরিষার তেল আর সব মসলা মিলিয়ে ধিমে আঁচে কষানোর ফলে। কষানোর কৌশলেই রান্নায় ওই কালচে-লালচে আভা ফুটে ওঠে।

২. রাঁধুনি মসলা না থাকলে এর বিকল্প হিসেবে কী ব্যবহার করব?

সত্যি বলতে কী, রাঁধুনি মসলার সেই চেনা ঝাঁঝ আর তীব্র সুবাসই হলো কালা ভুনার আসল প্রাণ। হাতের কাছে একেবারেই না পেলে হয়তো সামান্য মৌরি গুঁড়ো আর পাঁচফোড়ন গুঁড়ো দিয়ে কাজ চালাতে পারেন। তবে চট্টগ্রামের সেই আসল স্বাদটি যদি পেতে চান, তবে যেকোনো বড় মসলার দোকান বা সুপারশপ থেকে একটু খুঁজে রাঁধুনি মসলা নিয়ে আসাই ভালো।

৩. কালা ভুনা রান্নায় কোন পাত্র ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো?

ভারী লোহার কড়াই এই রান্নার জন্য সবচেয়ে সেরা। লোহার পাত্রে তাপটা সমানভাবে ছড়ায় এবং মাংসের সেই ঐতিহ্যবাহী গাঢ় কালচে রঙটা খুব সুন্দরভাবে খোলে। লোহার কড়াই না থাকলে যেকোনো ভারী তলাওয়ালা নন-স্টিক বা দস্তার পাত্রেও রান্না করতে পারেন, যাতে নিচে লেগে না যায়।

৪. মাংস নরম করার জন্য কি আলাদা জল দিতে হবে?

নাহ্, ঐতিহ্যবাহী উপায়ে রাঁধতে গেলে এই রান্নায় কোনো জল ছোঁয়াতেই হয় না। ম্যারিনেশনের পর ঢাকা দিয়ে মৃদু আঁচে কষালে মাংসের গা থেকে যে জল বেরোবে, তাতেই মাংস চমৎকার সেদ্ধ হয়ে একদম নরম তুলতুলে হয়ে যাবে। তবে মাংস যদি খুব শক্ত হয় এবং সেদ্ধ হতে সময় নেয়, তবে সামান্য গরম জল ছিটিয়ে দিতে পারেন। ভুলেও কিন্তু ঠান্ডা জল দেবেন না।

📌 শেষ কথা

প্রিয় রাঁধুনি বন্ধুরা, চট্টগ্রামের খাঁটি গরুর মাংসের কালা ভুনা তৈরির এই ঘরোয়া ও সহজ রেসিপিটি আশা করি আপনাদের হেঁশেলে এক নতুন আমেজ নিয়ে আসবে। রান্নাটি করতে কিছুটা ধৈর্য লাগলেও গরম গরম ভাতে বা পরোটায় প্রথম কামড় দেওয়ার পর যখন সবাই ধন্য ধন্য করবে, তখন আপনার সমস্ত কষ্ট এক নিমেষেই মুছে যাবে। আপনি যখন এই পদটি ঘরে তৈরি করবেন, কেমন হলো তা আমাকে কমেন্ট বক্সে লিখে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! আপনাদের রান্নার গল্প আর মিষ্টি কমেন্টগুলো আমাকে নতুন নতুন রেসিপি সাজাতে ভীষণ উৎসাহ দেয়। এই ধরনের আরও চেনা-অচেনা রান্নার রেসিপি পেতে আমাদের সাইটটি সেভ করে রাখুন এবং বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নিন। মন খুলে রাঁধুন, মন ভরে খাওয়ান। হ্যাপি কুকিং!

ট্যাগ: #ঐতিহ্যবাহী কালা ভুনা#কালা ভুনা রেসিপি#গরুর মাংস রান্না#গরুর মাংসের কালা ভুনা#গরুর মাংসের কালা ভুনা রেসিপি#গরুর মাংসের রেসিপি#চট্টগ্রামের কালা ভুনা#বাংলা রেসিপি#মাংসের কালা ভুনা#মাংসের পদ#রান্না#সহজ কালা ভুনা রেসিপি
শেয়ার করো: Facebook Telegram WhatsApp