
গরম গরম ফুলকো লুচি ও আলুর দম—এই নামটা শুনলেই জিভে জল আসে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। মাত্র ৬০ মিনিটে (যার মধ্যে ৩০ মিনিট প্রস্তুতি আর ৩০ মিনিট রান্না) এই চেনা পদটিই সাধারণ কোনো খাবার টেবিলকে জমজমাট উৎসবে বদলে দিতে পারে। একদিকে ধবধবে সাদা নরম তুলতুলে লুচি, আর অন্যদিকে আলুর গায়ে মাখামাখা হয়ে থাকা ঝাল-মিষ্টি মশলাদার ছোট আলুর দম—সকালের নাস্তায় বা অতিথিদের মন জয় করতে এর চেয়ে খাসা পদ আর কী-ই বা হতে পারে!
ছুটির দিনের অলস সকাল হোক কিংবা শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টি—পাত পেড়ে গরম লুচি ও আলুর দম খাওয়ার আনন্দই আলাদা। আমাদের এদিকের উৎসব-পার্বণ বা ঘরোয়া আড্ডায় এই যুগলবন্দী যেন এক পরম তৃপ্তি। মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। ছুটির দিনে দিদিমার রান্নাঘর থেকে যখন খাঁটি সরিষার তেলে আলু কষানোর সুবাস ভেসে আসত, আমরা ভাইবোনেরা পিঁড়ি পেতে বসে যেতাম। দিদিমা হাসিমুখে বলতেন, “রান্নায় তাড়াহুড়ো করলে স্বাদ মাটি রে পাগলি! মশলাটা একটু সময় নিয়ে ধিমে আঁচে কষাতে হবে, তবেই না আলুর ভেতর অবধি নুন-ঝাল ঢুকবে।” দিদিমার সেই হেঁশেলের গন্ধ আর হাতের জাদু আজও আমার মনে ঠিক একই রকম তাজা রয়ে গেছে।
আসলে ঘরের রান্নার একটা অন্যরকম টান থাকে, যা বাইরের নামী রেস্তোরাঁতেও কেনা যায় না। নিজের হাতে পরম মমতায় রাঁধার মাঝে যে তৃপ্তি, তা-ই লুকিয়ে থাকে এই সাবেকি রান্নায়। রান্নাঘরে যারা একেবারে নতুন হাত দিয়েছেন, তারাও যাতে খুব সহজে এবং প্রথমবারেই একদম তুলতুলে ফুলকো লুচি আর রেস্তোরাঁর স্বাদের আলুর দম বানিয়ে নিতে পারেন, সেই চাবিকাঠিই আজ হাত খুলে বলব। প্রতিটি ধাপ এমনভাবে বুঝিয়ে দেব, যেন কোনো খুঁত না থাকে। বাড়ির সবাইকে নিজের হাতের জাদুতে চমকে দিতে তৈরি তো? তাহলে চলুন, চটপট দেখে নেওয়া যাক আজকের আয়োজন। আর হ্যাঁ, মনের মতো আরও রান্নার খোঁজ পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সব বাংলা রেসিপি পাতায় কিন্তু ঢুঁ মারতে পারেন যেকোনো সময়।

| বৈশিষ্ট্য | তথ্য |
|---|---|
| পরিবেশন | ৪ জন |
| প্রস্তুতি সময় | ৩০ মিনিট |
| রান্নার সময় | ৩০ মিনিট |
| কঠিনতা | সহজ-মাঝারি |
ঐতিহ্যবাহী লুচি ও আলুর দম রেসিপি তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান
হেঁশেলের একটা সাধারণ নিয়ম আছে—রান্না শুরুর আগে সব জিনিস গুছিয়ে নিলে অর্ধেক কাজ এমনিতেই হয়ে যায়। উপকরণগুলোর পরিমাপ ঠিকঠাক থাকলে স্বাদও খোলতাই হয় চমৎকার। চলুন, ঝটপট দেখে নিই এই রান্নার জন্য আমাদের কী কী জিনিস প্রয়োজন হবে:
লুচি তৈরির উপকরণ:
- ৩ কাপ — ময়দা (লুচি ধবধবে সাদা আর নরম করতে ময়দার বিকল্প নেই)
- ১/২ চা চামচ — লবণ (স্বাদের সমতা বজায় রাখার জন্য)
- প্রয়োজনমতো — সয়াবিন তেল (ময়ান দেওয়া আর ডুবো তেলে ভাজার জন্য)
- ১ কাপ (বা প্রয়োজনমতো) — কুসুম গরম জল (খামির নরম ও তুলতুলে করে মাখার জন্য)
আলুর দম তৈরির উপকরণ:
- ৫০০ গ্রাম — ছোট আলু (সেদ্ধ করে খোসা ছাড়ানো; শীতের নতুন আলু হলে তো সোনায় সোহাগা)
- ৩ টেবিল চামচ — সরিষার তেল (আলুর দমে খাঁটি সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধটা দারুণ লাগে)
- ১/২ চা চামচ ও ১টি — গোটা জিরে ও তেজপাতা ( hissing sound ও ফোঁড়নের সুগন্ধের জন্য)
- ১ ইঞ্চি ও ২টি — দারুচিনি ও এলাচ (গরম মশলার সেই চিরচেনা মিষ্টি গন্ধের জন্য)
- ১/২ কাপ — পেঁয়াজ কুচি (একেবারে মিহি করে কাটা)
- ১ চা চামচ ও ১/২ চা চামচ — আদা ও রসুন বাটা
- ১ চা চামচ করে — জিরা ও ধনে গুঁড়ো
- ১/২ চা চামচ ও ১ চা চামচ — হলুদ ও লাল মরিচ গুঁড়ো (ঝালটা যে যার নিজের মুখের সোয়াদ বুঝে দেবেন)
- ১/২ কাপ — টমেটো পিউরি বা কুচি (ঝোলটা মাখামাখা আর হালকা টক-মিষ্টি করতে)
- ৩-৪টি — কাঁচামরিচ (মাঝখান থেকে ফালি করা কিংবা আস্ত)
- ১/২ চা চামচ — গরম মশলা গুঁড়ো (রান্নার শেষ পাতে চমৎকার সুবাসের জন্য)
- ২ টেবিল চামচ — ধনেপাতা কুচি (ওপর থেকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য)
- স্বাদমতো — লবণ ও চিনি
ধাপে ধাপে লুচি ও আলুর দম তৈরি করার পদ্ধতি
সব জোগাড়যন্তর তো শেষ, এবার হাতা-খুন্তি তোলার পালা! রান্না কিন্তু এক প্রকার সাধনা, প্রতিটা ধাপ মন দিয়ে আর যত্ন সহকারে করলে সাধারণ আলুও অমৃত হয়ে উঠতে পারে। চলুন, সহজ ভাষায় রান্নার প্রতিটা ধাপ এক এক করে জেনে নিই:
- ময়দার ময়ান দেওয়া: সবার আগে একটা বড় ছড়ানো গামলা বা থালায় ৩ কাপ ময়দা ঢেলে নিন। এবার তাতে ১/২ চা চামচ লবণ আর ২ টেবিল চামচ সয়াবিন তেল ছড়িয়ে দিন। এবার হাত দিয়ে সময় নিয়ে ভালো করে ঘষে ঘষে ময়দাটা মেখে নিন। একেই বলে ময়ান দেওয়া—লুচি নরম হওয়ার এটাই কিন্তু আসল রহস্য। ময়ান ঠিকঠাক হলো কি না বুঝবেন কী করে? মুঠো করে কিছুটা ময়দা ধরুন; যদি মুঠ পাকিয়ে যায় এবং আলতো টোকায় আবার ঝুরঝুরে হয়ে ভেঙে পড়ে, তবে বুঝবেন ময়ান একদম খাসা হয়েছে।
- ডো মেখে বিশ্রাম দেওয়া: এবার ওই ময়দায় অল্প অল্প করে কুসুম গরম জল ঢালতে থাকুন। ভুলেও একবারে সব জল ঢালবেন না, তাহলে কিন্তু কাই নরম হয়ে যাবে। হাত দিয়ে চেপে চেপে বেশ নরম অথচ টানটান একটা ডো বা তাল বানিয়ে ফেলুন। খুব বেশি শক্তও হবে না, আবার হাতে লেগে থাকবে তেমন নরমও নয়। মাখা হয়ে গেলে একটা সুতি কাপড় সামান্য ভিজিয়ে নিংড়ে নিয়ে ময়দার তালটা ঢেকে রেখে দিন ২০-২৫ মিনিট। এই বিশ্রামের ফলে ময়দা নরম হবে আর বেলার সময় একটুও গুটিয়ে যাবে না।
- আলু কেচে নেওয়া: ময়দা ওদিকে জিরিয়ে নিক, সেই ফাঁকে আমরা আলুর দমটা গুছিয়ে ফেলি। সেদ্ধ করে খোসা ছাড়ানো ৫০০ গ্রাম ছোট আলু একটা কাঁটাচামচ বা টুথপিক দিয়ে চারপাশ একটু খুঁচিয়ে বা কেচে নিন। এই ছোট্ট কাজটুকু করলে তরকারির নুন-মশলা আলুর একেবারে ভেতর পর্যন্ত ঢুকবে, খাওয়ার সময় আলু মুখে দিলে পানসে লাগবে না। এবার কেচে নেওয়া আলুগুলোতে সামান্য নুন আর হলুদ মাখিয়ে মিনিট পাঁচেক রেখে দিন।
- আলু ভেজে নেওয়া: এবার চুলায় কড়াই বসিয়ে ৩ টেবিল চামচ সরিষার তেল ভালো করে গরম হতে দিন। তেল থেকে হালকা ধোঁয়া বেরোলে নুন-হলুদ মাখানো আলুগুলো সাবধানে কড়াইতে ছেড়ে দিন। মাঝারি আঁচে আলতো করে নেড়েচেড়ে আলুগুলো লালচে-সোনালী করে ভেজে নিতে হবে। ভাজার সুন্দর সুবাস ছড়ালে তেল ছেঁকে আলুগুলো একটা বাটিতে তুলে রাখুন।
- ফোঁড়নের সুবাস ও পেঁয়াজ ভাজা: কড়াইয়ে যেটুকু তেল রইল, তাতেই ১/২ চা চামচ গোটা জিরে, ১টি তেজপাতা, ১ ইঞ্চি দারুচিনি আর ২টি এলাচ ফোঁড়ন দিন। মশলাটা একটু ফাটতে শুরু করলেই ১/২ কাপ পেঁয়াজ কুচি ছেড়ে দিন। মাঝারি আঁচে পেঁয়াজটা নাড়তে নাড়তে যখন সুন্দর সোনালী রঙ ধরবে, তখন তাতে ১ চা চামচ আদা বাটা আর ১/২ চা চামচ রসুন বাটা দিয়ে দিন। মশলার কাঁচা গন্ধটা চলে যাওয়া পর্যন্ত ভালো করে নেড়েচেড়ে কষিয়ে নিন।

- গুঁড়ো মশলার পেস্ট ও কষানো: একটা ছোট বাটিতে ১ চা চামচ করে জিরে গুঁড়ো ও ধনে গুঁড়ো, সাথে ১/২ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো আর ১ চা চামচ লাল মরিচের গুঁড়ো সামান্য জল দিয়ে গুলে একটা মসৃণ পেস্ট বানিয়ে নিন। সরাসরি গুঁড়ো মশলা তেলে দিলে অনেক সময় পুড়ে যায়, জল দিয়ে গুলিয়ে নিলে সেই ভয় থাকে না। এবার এই পেস্ট কড়াইতে ঢেলে দিন। সঙ্গে দিন ১/২ কাপ টমেটো পিউরি বা কুচি আর স্বাদমতো লবণ। ধিমে আঁচে কষাতে থাকুন, যতক্ষণ না মশলার ধার দিয়ে তেল আলগা হয়ে ওপরে ভেসে উঠছে। কষানোর ওপরেই কিন্তু আলুর দমের আসল স্বাদ নির্ভর করে।
- আলুর দম নামানোর শেষ প্রস্তুতি: মশলা থেকে তেল ছেড়ে এলে ভেজে রাখা আলুগুলো কড়াইতে দিয়ে দিন। আলুর গায়ে মশলাটা ভালো করে মাখিয়ে নিয়ে মিনিট দুয়েক কষান, তারপর সামান্য গরম জল ঢালুন। মনে রাখবেন, আলুর দমের ঝোল কিন্তু পাতলা হবে না, বেশ মাখামাখা থাকবে। এবার ঢাকা দিয়ে মাঝারি আঁচে ৫-৭ মিনিট ফুটতে দিন। ঝোল ঘন হয়ে আলুর গায়ে লেপ্টে এলে ওপর থেকে ১/২ চা চামচ গরম মশলা গুঁড়ো, ৩-৪টি কাঁচামরিচ আর ২ টেবিল চামচ ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিন। চাইলে এই সময়ে একটু চিনি দিতে পারেন, নুন-মিষ্টির স্বাদটা খোলতাই হবে। এক মিনিট পর আঁচ বন্ধ করে ঢাকা দিয়ে রাখুন, সুবাসটা যেন রান্নার ভেতরেই জমে থাকে।
- লুচির লেচি কেটে বেলা: এবার আমাদের জিরিয়ে নেওয়া ময়দার তালের কাছে ফেরার পালা। ঢাকা খুলে ময়দাটা হাত দিয়ে আরও একবার হালকা মেখে নিয়ে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। চাকি আর বেলনে সামান্য সয়াবিন তেল মাখিয়ে নিন। ভুলেও বেলার সময় শুকনো ময়দার গুঁড়ো ছড়াবেন না। এক একটি লেচি নিয়ে আলতো হাতে গোল গোল করে বেলে নিন। খেয়াল রাখবেন, লুচি যেন সবদিকে সমান পাতলা হয়; একদিক মোটা আর একদিক পাতলা হলে কিন্তু লুচি ফুলতে চাইবে না।
- গরম তেলে লুচি ভাজা: কড়াইতে বেশ khanikটা সয়াবিন তেল দিয়ে খুব ভালো করে গরম করে নিন। তেল ঠিকঠাক গরম হয়েছে কি না জানতে ছোট্ট একটু ময়দার টুকরো ফেলে দেখুন; যদি ওটা সঙ্গে সঙ্গে ভেসে ওঠে, বুঝবেন তেল তৈরি। এবার আঁচ মাঝারি করে বেলে রাখা লুচি তেলের মধ্যে আলতো করে ছেড়ে দিন। লুচিটা ওপরে ভেসে ওঠার সাথে সাথেই ঝাঁঝরি হাতা দিয়ে ওপর থেকে একটু চেপে ধরলেই দেখবেন বলের মতো ফুলে উঠেছে। এবার উল্টে দিয়ে ওপিঠটাও হালকা সোনালী করে ভেজে তুলে নিন। তেল ঝরিয়ে গরম গরম লুচি সাজিয়ে রাখুন পাত্রে।
পারফেক্ট লুচি ও আলুর দমের কিছু দরকারি টিপস
রান্না তো হলো, তবে সাধের রান্নাকে যদি একদম নিখুঁত করতে চান, তবে কিছু ছোটখাটো ঘরোয়া কৌশল মাথায় রাখা দরকার। রান্নাঘরে বছরের পর বছর খুন্তি নাড়তে নাড়তে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেখান থেকেই কিছু দরকারি কথা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিচ্ছি:
- তেলের আঁচের খেল: লুচি ফোলানোর আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে ময়ান আর তেলের তাপমাত্রায়। তেল যদি কম গরম হয়, তবে লুচি তেলের নিচে পড়ে থাকবে, ফুলবে তো নাই-ই, উল্টে গাদাখানেক তেল শুষে চপচপে হয়ে যাবে। আবার অতিরিক্ত গরম তেলে লুচি ছাড়লে সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে লাল হয়ে যাবে কিন্তু ফুলকো হবে না।
- तेल দিয়ে বেলা: লুচি বেলার সময় শুকনো ময়দা ভুলেও ছড়াবেন না, তেল দিয়েই বেলবেন। শুকনো ময়দা ছড়ালে ভাজার সময় সেই ময়দা পুড়ে তেল কালো হয়ে যায়। কড়াইয়ের নিচে কালো তলানি জমে পরবর্তী লুচিগুলোর গায়ে লেগে দেখতে খারাপ লাগে।
- এক চিমটে চিনির জাদু: আলুর দমে সামান্য একটু চিনি দিলে স্বাদ আর রঙ দুটোই খোলে। চিনি মশলার বাড়তি টক বা ঝাল ভাবটা কেটে দিয়ে স্বাদের এক দারুণ মেলবন্ধন ঘটায় এবং ঝোলের রঙকেও চমৎকার করে তোলে।
- নিরামিষ আলুর দম করতে চাইলে: অনেকে পূজাপার্বণে নিরামিষ খেতে পছন্দ করেন। সে ক্ষেত্রে পেঁয়াজ-রসুন বাদ দিয়ে দিন। ফোঁড়নে সামান্য হিং আর আদা-জিরে বাটা মশলা দিয়ে কষালে চমৎকার নিরামিষ স্বাদ পাওয়া যায়। এই নিরামিষ পদের সঙ্গে চাইলে পাতের শোভা বাড়াতে সাজিয়ে নিতে পারেন আরেকটি সাবেকি পদ, যেমন পাঁচমিশালি নিরামিষ সবজি রেসিপি: সহজে তৈরি সাবেকি স্বাদ।
- জোয়ান বা কালোজিরার ফ্লেভার: লুচির ময়দা মাখার সময় সামান্য জোয়ান বা কালোজিরা মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে খাওয়ার সময় চমৎকার একটা গন্ধ পাওয়া যায়, আবার ভাজাভুজি হলেও সহজে হজম হয়ে যায়।
পরিবেশন আর গুছিয়ে রাখার সহজ উপায়
বাঙালির রান্না যেমন আন্তরিক, পরিবেশনও তেমন ভালোবাসায় মাখানো হতে হয়। কাঁসার থালায় গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ফুলকো লুচি আর বাটি ভরা মাখামাখা লালচে আলুর দম সাজিয়ে দিলে কে না লোভ সামলাতে পারবে বলুন! পাশে একটু পেঁয়াজের রিং, এক ফালি লেবু আর গোটা কাঁচামরিচ দিয়ে দিলে তো কথাই নেই। আর উৎসবের দিনে যদি মিষ্টিমুখের জন্য শেষ পাতে ঐতিহ্যবাহী ক্ষীরসা পাটিসাপটা পিঠা রেসিপি: তুলতুলে নরম পিঠার সহজ নিয়ম থাকে, তবে আমন্ত্রিত অতিথিরা আপনার রান্নার তারিফ আজীবন মনে রাখবে।
হঠাৎ করেই অনেক সময় লুচির খামির বা ডো বেঁচে যায়। সে ক্ষেত্রে ওপরে সামান্য তেল মাখিয়ে একটা এয়ারটাইট বক্সে ভরে ফ্রিজে রেখে দিতে পারেন ২ দিন পর্যন্ত। তবে ভাজার অন্তত আধঘণ্টা আগে ফ্রিজ থেকে বের করে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এনে তারপর বেলবেন। আর বেঁচে যাওয়া আলুর দম ফ্রিজে ৩ দিন পর্যন্ত অনায়াসে ভালো থাকে। খাওয়ার আগে সামান্য একটু গরম জল ছিটিয়ে কড়াইতে ধিমে আঁচে গরম করে নিলে স্বাদ একদম তাজা সেদ্ধ আলুর মতোই লাগবে।

লুচি ও আলুর দমের পুষ্টিগুণ
স্বাদের পাশাপাশি শরীরের স্বাস্থ্যের কথাটাও একটু বলে রাখি। লুচি ও আলুর দম মূলত শরীরে ভরপুর শক্তি জোগায়। ময়দা আর আলু থেকে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট মেলে, যা আমাদের চটজলদি চাঙ্গা করে তোলে। আর আলুর দমে যে সব ঘরোয়া মশলা যেমন—হলুদ, জিরে, আদা আর রসুন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আমাদের হজমশক্তি বাড়াতে আর রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। তবে হ্যাঁ, যেহেতু লুচি ডুবো তেলে ভাজা হয়, তাই ক্যালরির পরিমাণ একটু বেশিই থাকে। যারা ডায়েট নিয়ে ভাবেন, তারা একটু মেপে খাবেন। তবে ছুটির দিনে বা কোনো পার্বণে পরিবারের সবাইকে নিয়ে জমিয়ে পাত পাড়ার জন্য এর চেয়ে সেরা আর কিছু হতেই পারে না।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. আমার লুচি কেন তেলের মধ্যে ঠিকমতো ফুলতে চায় না?
লুচি না ফোলার মূল কারণ হতে পারে তেলের আঁচ ঠিক না থাকা কিংবা ময়দা মাখার সময় ময়ান কম হওয়া। ময়দা মাখবার সময় তেলের মাপটা ঠিক রেখে ভালো করে ঘষে ঘষে ময়ান দেবেন। আর মনে রাখবেন, ভাজার তেল যেন একদম ধোঁয়া ওঠা গরম হয়। বেলার সময় লুচি সবদিকে সমান পাতলা না হলেও কিন্তু ঠিকমতো ফুলতে চায় না।
২. ছোট আলু না থাকলে বড় আলু দিয়ে কি এই রেসিপিটি করা যাবে?
একেবারেই যাবে! হাতের কাছে ছোট আলু না থাকলে ঘরে থাকা সাধারণ বড় আলুর খোসা ছাড়িয়ে ডুমো ডুমো (চার টুকরো) করে কেটে নিন। তারপর হালকা সেদ্ধ করে একই নিয়ম মেনে রান্না করে ফেলুন। তবে বড় আলুর গায়েও কিন্তু টুথপিক বা কাঁটাচামচ দিয়ে খুঁচিয়ে নিতে একদম ভুলবেন না!
৩. আলুর দমে সরিষার তেলের পরিবর্তে সয়াবিন তেল ব্যবহার করা যাবে কি?
অনায়াসে ব্যবহার করতে পারেন। তবে সরিষার তেলের নিজস্ব ঝাঁঝ আর যে ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে, তা আলুর দমের স্বাদকে একদম অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। খাঁটি সাবেকি স্বাদ পেতে চাইলে সরিষার তেল ব্যবহারের কথাই বলব। তবে কোনো কারণে সয়াবিন তেল ব্যবহার করলেও স্বাদের খুব একটা বড় রকম তারতম্য হবে না।
৪. লুচির খামির বা ডো কতক্ষণ আগে মেখে রাখা সবচেয়ে ভালো?
লুচির ময়দা অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট আগে মেখে ঢাকা দিয়ে রাখা ভালো। এতে ময়দার তালটা নরম ও নমনীয় হওয়ার সময় পায়। মাখার সঙ্গে সঙ্গেই লুচি বেলতে গেলে বেলার সময় তা বারবার গুটিয়ে যায় আর ভাজার পর লুচি নরম না হয়ে শক্ত পাপড়ের মতো হয়ে যায়।
📌 শেষ কথা
আমার প্রিয় বন্ধুরা, রান্না তো কেবল পেট ভরানো নয়, এ তো এক মুঠো ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার উপায়। নিজের হাতে ভালোবেসে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ফুলকো লুচি আর আলুর দম বানিয়ে যখন পরিবারের পাতে পরিবেশন করবেন, তখন তাঁদের মুখের ওই তৃপ্তির হাসিটার কোনো তুলনা হয় না। আশা করি, আমার হেঁশেলের এই চেনা পদের সহজ রেসিপিটি আপনাদের মন ছুঁয়ে গেছে। বাড়িতে বানিয়ে কেমন হলো, আপনার বাড়ির লোক আঙুল চেটেপুটে খেল কি না, তা নিচে কমেন্ট করে আমাকে জানাতে কিন্তু ভুলবেন না! আপনাদের ছোট্ট একটা মিষ্টি মন্তব্য আমাকে নতুন নতুন রান্নার বড় উৎসাহ দেয়। রেসিপিটি ভালো লাগলে ফেসবুক বা অন্য কোথাও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে নিতে পারেন। এমন সুন্দর রান্নার খোঁজ প্রতিনিয়ত পেতে আমাদের পেজটি বুকমার্ক করে রাখতে পারেন। সবাই খুব ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর মন ভরে রান্না করতে থাকুন। আমাদের অন্যান্য পদের হাঁড়ির খবর পেতে আরও রেসিপি দেখুন লিংকে ক্লিক করুন।


