
সরকারি স্কুল ভর্তি ২০২৭-এ প্রথম শ্রেণিতে কোনো পরীক্ষা হবে না — শিক্ষার্থী বাছাই হবে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে। আর দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শূন্য আসনে ভর্তি হবে লিখিত পরীক্ষার মেধাক্রম অনুযায়ী। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে এই নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এই লেখায় বয়স, ফি, মানবণ্টন আর আবেদনের নিয়ম — সবকিছু একসঙ্গে পাবেন।
সন্তানকে সরকারি স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে অভিভাবকদের টেনশনটা আমি খুব ভালো বুঝি। একদিকে ফেসবুকে নানা তারিখ ঘুরে বেড়ায়, অন্যদিকে পাড়ার কোচিং সেন্টার থেকে ফোন আসে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা বলে। এর মাঝে আসল নীতিমালাটা কী বলছে, সেটাই অনেকে জানেন না। অনেকে ইংরেজিতে Government School Admission 2027 লিখেও খোঁজেন, কিন্তু বাংলায় পরিষ্কার ব্যাখ্যা পান না। এই লেখাটা সেই বিভ্রান্তি দূর করার জন্যই — কোন শ্রেণিতে লটারি, কোন শ্রেণিতে পরীক্ষা, কত বয়স লাগবে, কত ফি দিতে হবে, আর কোথায় ভুল করলে আবেদন বাতিল হবে, সবই ধাপে ধাপে লেখা আছে।
সরকারি স্কুল ভর্তি ২০২৭-এ কী ঘোষণা হয়েছে?
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালার সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত দুটি: প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী বাছাই হবে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে, আর দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শূন্য আসনে ভর্তি হবে লিখিত পরীক্ষার মেধাক্রম অনুযায়ী। আবেদন, ফি জমা, ফল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকাশ — সবকিছুই হবে অনলাইনে।
নীতিমালার নাম ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা-২০২৭’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে এটি প্রকাশ করে। আমার অভিজ্ঞতায়, প্রতি বছর ভর্তির মৌসুম এলেই অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকে দুটি জায়গায় — সন্তানের বয়স ঠিক আছে কি না, আর আবেদনপত্রে কোনো ভুল হলো কি না। এই লেখায় আমি সেই দুটি প্রশ্নের উত্তর তো দেবই, সঙ্গে পুরো নীতিমালাটা এমনভাবে ভেঙে দেব যাতে একবার পড়লেই আর কোথাও খুঁজতে না হয়।
একটা কথা শুরুতেই পরিষ্কার করে দিই। নীতিমালা প্রকাশ মানেই আবেদন শুরু নয়। নীতিমালায় ভর্তির পদ্ধতি, বয়স, ফি আর পরীক্ষার মানবণ্টন ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আবেদন কবে শুরু হবে, লটারি কবে হবে — সেই আলাদা বিজ্ঞপ্তি আসবে পরে। তাই যেখানে তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি, সেখানে আমি তারিখ বানিয়ে লিখব না। শেষের দিকে সেই সতর্কতার অংশটুকু মন দিয়ে পড়বেন।
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি: লটারি কীভাবে হবে?
প্রথম শ্রেণিতে কোনো লিখিত পরীক্ষা হবে না। শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে। এই লটারি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সংক্ষেপে মাউশি। ভর্তি কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে লটারি সম্পন্ন করতে হবে, আর পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে নীতিমালায়।
লটারির আগে যে সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে, তার যথার্থতা সরকার স্বীকৃত অন্য একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করাতে হবে। যাচাই-সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। কথাটা শুনতে আমলাতান্ত্রিক মনে হতে পারে, কিন্তু অভিভাবক হিসেবে এটা আপনার জন্য আশ্বাসের খবর। লটারি যেন সত্যিই দৈবচয়ন হয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই যাচাইয়ের ব্যবস্থা।
আবেদনের সময় একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি বিদ্যালয়ে পছন্দক্রম দিতে পারবে। এখানে একটা সূক্ষ্ম নিয়ম আছে, যেটা অনেকেই ভুল করেন। ডাবল শিফট, অর্থাৎ দুই পালায় চলা কোনো বিদ্যালয়ের দুই শিফটই পছন্দ করলে তা দুটি বিদ্যালয়ের পছন্দক্রম হিসেবে গণ্য হবে। ধরুন, আপনি একটি স্কুলের সকাল ও দুপুর — দুই শিফটই বেছে নিলেন। তাহলে আপনার পাঁচটি পছন্দের মধ্যে দুটি শেষ। বাকি থাকল তিনটি।
আরেকটি কঠোর নিয়ম: একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সব আবেদন বাতিল হয়ে যাবে। আমি দেখেছি, অনেক অভিভাবক ‘একটা বেশি করলে সুযোগ বাড়বে’ ভেবে একই স্কুলে দুবার আবেদন করে ফেলেন। এটা করবেন না। একই স্কুলে একবারই আবেদন করবেন, তথ্য ঠিকঠাক যাচাই করে।
লটারিতে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকার পাশাপাশি শূন্য আসনের সমানসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি করতে হবে। নির্বাচিত কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি কমিটির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তি না হলে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে এবং নোটিশ বোর্ডেও টাঙিয়ে দিতে হবে। তালিকার বাইরে কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা যাবে না — নীতিমালায় এটা স্পষ্টভাবে বলা আছে।
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির বয়স কত হতে হবে?
বয়স হিসাব করা হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি তারিখের ভিত্তিতে। ওই দিনে শিশুর বয়স সর্বনিম্ন ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের মধ্যে হতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির বয়স ৬ বছরের বেশি ধরা হলেও নীতিমালায় ৫ থেকে ৭ বছরের এই জানালাটা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ৬ বছর বয়সী শিশু তো বটেই, ৫ বছর পেরোনো শিশুও আবেদন করতে পারবে, আবার ৭ বছর পর্যন্ত সুযোগ থাকছে।
| বিষয় | নিয়ম |
|---|---|
| বয়স গণনার তারিখ | ১ জানুয়ারি ২০২৭ |
| বয়সের সীমা | ৫ বছর থেকে ৭ বছর |
| জাতীয় শিক্ষানীতির মান | ৬ বছরের বেশি |
| বয়সের প্রমাণ | অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি |
| বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী | সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত অতিরিক্ত সুবিধা |
বয়স প্রমাণের জন্য জমা দিতে হবে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি। হাতে লেখা পুরোনো সনদ দিয়ে কাজ হবে না — অনলাইন জন্ম নিবন্ধন লাগবে। যাঁদের সন্তানের জন্ম নিবন্ধনে ভুল আছে, তাঁরা এখনই সংশোধন করে নিন। ভর্তির সময় এসে এই কাগজ ঠিক করতে গেলে অযথা দৌড়াদৌড়ি বাড়ে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের বয়স নির্ধারণে সর্বোচ্চ ৫ বছরের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া যাবে।
প্রতি শ্রেণির শাখায় শিক্ষার্থী থাকবে ৫৫ জন। এটা মনে রাখা জরুরি, কারণ আসনসংখ্যা সীমিত বলেই পছন্দক্রম সাজানোটা কৌশলের ব্যাপার। শুধু নামকরা স্কুলগুলোই পছন্দের তালিকায় রাখলে লটারিতে না আসার ঝুঁকি বাড়ে। কাছের ভালো স্কুলগুলোকেও তালিকায় রাখুন।
দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা: মানবণ্টন কেমন?
দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হবে শূন্য আসনের বিপরীতে, লিখিত পরীক্ষার মেধাক্রম অনুসারে। পরীক্ষার পূর্ণমান ৫০ নম্বর, সময় ১ ঘণ্টা। তিনটি বিষয় থাকবে — বাংলা, ইংরেজি আর গণিত। প্রশ্ন হবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পাঠ্যবই থেকে, আর তা হতে হবে মানসম্মত ও শ্রেণি-উপযোগী।
| বিষয় | নম্বর |
|---|---|
| বাংলা | ১৫ |
| ইংরেজি | ১৫ |
| গণিত | ২০ |
| মোট | ৫০ |
সময় মাত্র ১ ঘণ্টা, তাই গণিতের ২০ নম্বরটাই এখানে পার্থক্য গড়ে দেবে। আমার পরামর্শ, ছোটদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মুখস্থের চাপ দেবেন না। বরং পাঠ্যবইয়ের অঙ্কগুলো নিজে হাতে করতে দিন, আর বাংলা-ইংরেজির ছোট ছোট অনুচ্ছেদ পড়ে প্রশ্নের উত্তর লেখার অভ্যাস করান। এক ঘণ্টার পরীক্ষায় হাতের লেখার গতি আর প্রশ্ন বুঝে উত্তর দেওয়ার অভ্যাসটাই কাজে লাগে।
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা: মানবণ্টন কেমন?
ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার পূর্ণমান ১০০ নম্বর, সময় ২ ঘণ্টা। এখানেও একই তিনটি বিষয় — বাংলা, ইংরেজি আর গণিত — তবে নম্বর বণ্টন আলাদা। বাংলায় ৩০, ইংরেজিতে ৩০ আর গণিতে ৪০ নম্বর থাকবে।
| বিষয় | নম্বর |
|---|---|
| বাংলা | ৩০ |
| ইংরেজি | ৩০ |
| গণিত | ৪০ |
| মোট | ১০০ |
লক্ষ্য করুন, দুই স্তরেই গণিতের ওজন সবচেয়ে বেশি। এটা কাকতালীয় নয়। ভর্তি পরীক্ষায় গণিত দিয়ে যাচাই করা হয় শিক্ষার্থীর যুক্তি আর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। তাই প্রস্তুতির সময়টা তিন বিষয়ে ভাগ করে দিন, কিন্তু গণিতে একটু বেশি সময় রাখুন। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা: প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে নীতিমালায়। অর্থাৎ প্রশ্ন ফাঁসের গুজবে কান দেবেন না, কারও কাছ থেকে ‘প্রশ্ন আছে’ দাবিতে টাকা চাইলে সেটা প্রতারণা বলে ধরে নিন।
লিখিত পরীক্ষায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকার পাশাপাশি এখানেও শূন্য আসনের সমানসংখ্যক অপেক্ষমাণ তালিকা রাখতে হবে। কেউ নির্ধারিত সময়ে ভর্তি না হলে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে ভর্তি নেওয়া হবে। তাই পরীক্ষায় পাস করেও যাঁরা প্রথম তালিকায় নাম পাবেন না, তাঁরা অপেক্ষমাণ তালিকায় চোখ রাখবেন — সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি।
সরকারি স্কুল ভর্তি ফি ২০২৭ কত?
নীতিমালায় আবেদন ফির সর্বোচ্চ সীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির অনলাইন আবেদন ফি সর্বোচ্চ ১১০ টাকা। দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে আবেদন ফি সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা। সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
ফি নিয়ে একটা সতর্কবার্তা দিই। আবেদন ফি ছাড়া কেউ যদি ভর্তির নামে অতিরিক্ত টাকা চায়, সেটা নীতিমালার বাইরের দাবি। অনলাইনে আবেদন করার সময় টেলিটক বা নির্ধারিত মাধ্যমে ফি জমা দেওয়ার রসিদটা সংরক্ষণ করবেন। পরে কোনো জটিলতা হলে এই রসিদই আপনার প্রমাণ।
ঢাকায় ক্যাচমেন্ট কোটা: ৪০ শতাংশ আসন কী?
ঢাকা মহানগরীর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যাচমেন্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। বাকি ৬০ শতাংশ আসন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ক্যাচমেন্ট এলাকা বলতে বোঝায় স্কুলের আশপাশের নির্ধারিত এলাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বিদ্যালয়গুলোর ক্যাচমেন্ট এলাকা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের জানাবে।
এই নিয়মটা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ঢাকায় অনেক অভিভাবক দূরের নামকরা স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে চান, অথচ কাছের স্কুলের আসন খালি থাকে। ক্যাচমেন্ট কোটা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়। আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তাহলে আবেদন করার আগে জেনে নিন আপনার এলাকাটি কোন স্কুলের ক্যাচমেন্টে পড়ে। এটা জানা থাকলে পছন্দক্রম সাজাতে সুবিধা হবে।
আবেদন কীভাবে করবেন? ধাপে ধাপে গাইড
পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে হবে — আবেদন, ফি গ্রহণ, ফল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকাশ। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে ভুলের আশঙ্কা কমবে।
- প্রথমে সন্তানের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ ঠিক আছে কি না যাচাই করুন। নামের বানান, জন্মতারিখ মিলিয়ে নিন।
- সরকারি ভর্তির নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালে গিয়ে আবেদনপত্র খুলুন। অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া পোর্টাল ছাড়া অন্য কোনো সাইটে আবেদন করবেন না।
- শিক্ষার্থীর তথ্য, অভিভাবকের তথ্য আর পছন্দের বিদ্যালয়গুলো সাজিয়ে লিখুন। প্রথম শ্রেণির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচটি পছন্দ দেওয়া যাবে।
- ডাবল শিফট স্কুলের দুই শিফট বাছলে তা দুটি পছন্দ হিসেবে গণ্য হবে — এটা মাথায় রেখে তালিকা সাজান।
- একই বিদ্যালয়ে একাধিকবার আবেদন করবেন না। সাবমিট করার আগে পুরো ফরম আরেকবার পড়ে নিন।
- নির্ধারিত মাধ্যমে আবেদন ফি জমা দিন — প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ১১০ টাকা, দ্বিতীয় থেকে নবমে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা।
- আবেদনের কপি আর ফি জমার রসিদ প্রিন্ট করে বা ছবি তুলে সংরক্ষণ করুন।
- লটারি বা পরীক্ষার ফল সংশ্লিষ্ট স্কুলের ওয়েবসাইট ও নোটিশ বোর্ডে দেখুন। অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম থাকলে নিয়মিত খোঁজ রাখুন।
আবেদন করার সময় যে ভুলগুলো করবেন না
আমি দেখেছি, ভর্তির মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ছোট ছোট ভুলে। নিচের তালিকাটা একবার পড়ে নিলে সেই ভুলগুলো এড়ানো যাবে।
- একই স্কুলে একাধিক আবেদন করা — এতে সব আবেদন বাতিল হয়ে যাবে।
- জন্ম নিবন্ধনের তথ্য না মিলিয়ে আবেদন করা — পরে বয়স নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
- শুধু নামকরা স্কুল পছন্দের তালিকায় রাখা — আসন সীমিত, তাই কাছের ভালো স্কুলও রাখুন।
- ডাবল শিফটের নিয়ম না জেনে পছন্দ সাজানো — দুই শিফট মানেই দুটি পছন্দ শেষ।
- ফেসবুকের পোস্ট বা অপরিচিত সাইটের তারিখকে অফিসিয়াল তারিখ ভাবা — শুধু মন্ত্রণালয়, মাউশি আর সংশ্লিষ্ট বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিকেই বিশ্বাস করুন।
- ‘ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে’ বলে টাকা চাওয়া দালালের ফাঁদে পা দেওয়া — লটারি আর মেধাতালিকার বাইরে ভর্তির কোনো রাস্তা নেই।
- আবেদনের কপি আর ফি রসিদ না রাখা — পরে তথ্য যাচাই করতে গেলে এগুলোই লাগবে।
লটারি বনাম পরীক্ষা: প্রথম শ্রেণিতে লটারি কেন রাখা হলো?
এই প্রশ্নটা অনেকের মনে ঘুরছে। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা চালু করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত নীতিমালায় প্রথম শ্রেণিতে লটারি বহাল থাকল। কেন? শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলে আসছিলেন, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ বাড়বে। কোচিং আর প্রাইভেটনির্ভরতা নতুন করে বাড়তে পারে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়াবে।
কথাটা ভেবে দেখুন। ছয় বছর বয়সী একটা শিশুকে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিংয়ে পাঠানো — এটা কি শিশুর জন্য ভালো? আমার মতে, না। প্রথম শ্রেণিতে শিশুর মেধা যাচাইয়ের চেয়ে বড় কথা হলো স্কুলে যাওয়ার আনন্দটা যেন নষ্ট না হয়। লটারি সেই আনন্দটা বাঁচিয়ে রাখে। আর দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে পরীক্ষা থাকছে, কারণ ওই বয়সে শিশুরা পড়াশোনার ধারাবাহিকতায় ঢুকে গেছে, আর শূন্য আসনে মেধাক্রমে বাছাই করাটা যুক্তিসঙ্গত।
এর মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে কোচিং কার্যক্রম শুরুর অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অভিভাবক হিসেবে এখানে সচেতন থাকুন। প্রথম শ্রেণির জন্য কোনো কোচিংয়ের দরকার নেই। বরং শিশুকে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করান, গল্প শোনান, অক্ষর চিনতে শেখান খেলার ছলে।
আবেদন শুরুর তারিখ নিয়ে সতর্কতা
এই অংশটা মন দিয়ে পড়ুন, কারণ এখানেই সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়ায়। নীতিমালা প্রকাশ হয়েছে, কিন্তু আমি যেসব নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করেছি, সেখানে সরকারি স্কুল ভর্তির আবেদন শুরুর চূড়ান্ত তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। কিছু বেসরকারি ওয়েবসাইট ১৮ নভেম্বর ২০২৬ থেকে আবেদন শুরুর কথা লিখেছে, তবে তারা নিজেরাই সেটাকে ‘প্রত্যাশিত তারিখ’ বলে উল্লেখ করেছে এবং অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যাচাই করতে বলেছে।
তাই ১৮ নভেম্বরকে চূড়ান্ত তারিখ ধরে নিয়ে পরিকল্পনা করবেন না। আবেদন শুরুর ঘোষণা এলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি আর সংশ্লিষ্ট স্কুলের বিজ্ঞপ্তিতে সেটা জানিয়ে দেওয়া হবে। এই লেখার তথ্য ২৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত যাচাই করা। নতুন বিজ্ঞপ্তি এলেই আমরা এই পোস্ট হালনাগাদ করব। আপনারা যাঁরা অপেক্ষায় আছেন, তাঁরা মাঝে মাঝে মাউশির বিজ্ঞপ্তি দেখে নেবেন।
একই কথা লটারির তারিখ আর পরীক্ষার তারিখের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নীতিমালায় পদ্ধতি ঠিক হয়েছে, কিন্তু লটারি কবে, পরীক্ষা কবে — সেটা পরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হবে। কেউ যদি এখনই আপনাকে লটারির তারিখ বলে দেয়, বুঝবেন সেটা অনুমান, অফিসিয়াল তথ্য নয়।
অভিভাবকদের জন্য আমার পরামর্শ
আমার অভিজ্ঞতায়, ভর্তির সময় অভিভাবকদের উদ্বেগটা স্বাভাবিক, কিন্তু উদ্বেগ যেন সন্তানের ওপর চাপ হয়ে না চাপে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। প্রথম শ্রেণির লটারিতে ভাগ্য একটা বড় ভূমিকা রাখে — এটা মেনে নিন। পাঁচটি পছন্দ বুদ্ধিমানের মতো সাজান, কাছের স্কুলগুলোকে গুরুত্ব দিন, আর লটারিতে না হলে অপেক্ষমাণ তালিকায় চোখ রাখুন। একটা স্কুলে না হলে সন্তানের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যায় না — এই কথাটা নিজেকে মনে করিয়ে দিন।
দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণির পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শটা আলাদা। এখানে প্রস্তুতিই মূল চাবিকাঠি। পাঠ্যবইয়ের বাইরে গাইড বইয়ের অসংখ্য প্রশ্ন মুখস্থ করানোর চেয়ে পাঠ্যবইটা ভালোভাবে পড়ান। গণিতে নিয়মিত অনুশীলন করান, বাংলায় নিজের ভাষায় উত্তর লেখার অভ্যাস করান। পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা শেখান — কোন প্রশ্নে কতক্ষণ দেবে, সেটা বাড়িতে মক টেস্ট দিয়ে অভ্যাস করান।
আর শেষ পরামর্শটা সবচেয়ে জরুরি: কাগজপত্র আগেভাগে গুছিয়ে রাখুন। জন্ম নিবন্ধন, ছবি, আগের স্কুলের ছাড়পত্র — যা যা লাগতে পারে, সেগুলো একটা ফাইলে রাখুন। ভর্তির দিন সকালে কাগজ খুঁজতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করলে ভুল হয়। আমি নিজে এই ভুলের মাশুল দেখেছি অনেক পরিবারে।
অপেক্ষার এই সময়টাকে কাজে লাগান। আবেদন শুরু হওয়ার আগেই বাড়ির কাছের সরকারি স্কুলগুলোর তালিকা করে রাখুন, কোন স্কুলে কোন শিফট আছে জেনে নিন, আর সন্তানের জন্ম নিবন্ধন সনদে কোনো ভুল থাকলে এখনই সংশোধন করে ফেলুন। যাঁরা দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে চান, তাঁরা এখন থেকেই পাঠ্যবইয়ের অঙ্ক আর বাংলা-ইংরেজির অনুশীলন শুরু করে দিন। বিজ্ঞপ্তি এলে তখন আর তাড়াহুড়ো করতে হবে না, শুধু ঠান্ডা মাথায় আবেদনটা জমা দিলেই হবে।
সরকারি স্কুল ভর্তি ২০২৭: এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| শিক্ষাবর্ষ | ২০২৭ |
| নীতিমালা প্রকাশ | ১৩ অক্টোবর ২০২৬ রাতে |
| প্রথম শ্রেণি | কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারি (মাউশি) |
| দ্বিতীয়–পঞ্চম শ্রেণি | লিখিত পরীক্ষা, ৫০ নম্বর, ১ ঘণ্টা |
| ষষ্ঠ–নবম শ্রেণি | লিখিত পরীক্ষা, ১০০ নম্বর, ২ ঘণ্টা |
| প্রতি শাখায় আসন | ৫৫ জন |
| সর্বোচ্চ পছন্দ | ৫টি বিদ্যালয় |
| আবেদন ফি | প্রথম শ্রেণি সর্বোচ্চ ১১০ টাকা; দ্বিতীয়–নবম সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা |
| ঢাকা ক্যাচমেন্ট | ৪০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত |
| আবেদন পদ্ধতি | সম্পূর্ণ অনলাইন |
প্রশ্নোত্তর: সরকারি স্কুল ভর্তি ২০২৭ নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
প্রশ্ন: সরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি কীভাবে হবে?
উত্তর: প্রথম শ্রেণিতে কোনো লিখিত পরীক্ষা হবে না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করবে। আবেদনের সময় সর্বোচ্চ পাঁচটি বিদ্যালয়ে পছন্দক্রম দেওয়া যাবে।
প্রশ্ন: প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির বয়স কত লাগবে?
উত্তর: ১ জানুয়ারি ২০২৭ তারিখে শিশুর বয়স ৫ বছর থেকে ৭ বছরের মধ্যে হতে হবে। বয়স প্রমাণের জন্য অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি জমা দিতে হবে।
প্রশ্ন: দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা কেমন হবে?
উত্তর: শূন্য আসনে লিখিত পরীক্ষার মেধাক্রমে ভর্তি নেওয়া হবে। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ৫০ নম্বরের ১ ঘণ্টার পরীক্ষা, আর ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে ১০০ নম্বরের ২ ঘণ্টার পরীক্ষা হবে। বিষয় তিনটি: বাংলা, ইংরেজি ও গণিত।
প্রশ্ন: সরকারি স্কুল ভর্তির আবেদন ফি কত?
উত্তর: প্রথম শ্রেণিতে অনলাইন আবেদন ফি সর্বোচ্চ ১১০ টাকা, আর দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা। সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
প্রশ্ন: সরকারি স্কুল ভর্তির আবেদন কবে শুরু হবে?
উত্তর: নীতিমালা প্রকাশ হলেও আবেদন শুরুর চূড়ান্ত তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। কিছু সাইট ১৮ নভেম্বরকে প্রত্যাশিত তারিখ বলেছে, তবে সেটা অফিসিয়াল নয়। অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি এলে তবেই তারিখ চূড়ান্ত হবে।
প্রশ্ন: লটারিতে নাম না এলে কী হবে?
উত্তর: শূন্য আসনের সমানসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি করা হবে। নির্বাচিত কেউ নির্ধারিত সময়ে ভর্তি না হলে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে ভর্তি নেওয়া হবে। তাই অপেক্ষমাণ তালিকায় চোখ রাখুন।
প্রশ্ন: ঢাকায় ক্যাচমেন্ট কোটা কী?
উত্তর: ঢাকা মহানগরীর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্যাচমেন্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। বাকি ৬০ শতাংশ আসন সবার জন্য উন্মুক্ত। ক্যাচমেন্ট এলাকা নির্ধারণ করবে মাউশি।
উপসংহার
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের সরকারি স্কুল ভর্তির নীতিমালা একদিকে শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ কমিয়েছে, অন্যদিকে বড়দের জন্য মেধাভিত্তিক পরীক্ষার পথ খোলা রেখেছে। প্রথম শ্রেণির লটারি, স্পষ্ট বয়সসীমা, নির্ধারিত ফি আর অনলাইন প্রক্রিয়া — সব মিলিয়ে এবারের নীতিমালাটা অভিভাবকদের জন্য আগের চেয়ে স্বচ্ছ। তবে মনে রাখবেন, নীতিমালা জানা আর আবেদন করা এক কথা নয়। আবেদন শুরুর অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন, পছন্দের স্কুলগুলো ঠিক করে রাখুন, আর গুজবে কান দেবেন না।
ভর্তি সংক্রান্ত আরও খবর পেতে আমাদের একাদশ শ্রেণি ভর্তির তৃতীয় ধাপের পূর্ণ গাইড, এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা ২০২৭-এর নিয়ম এবং এসএসসি ফরম পূরণ ২০২৭-এর নির্দেশনা পড়ে নিতে পারেন। নতুন বিজ্ঞপ্তি এলেই এই পোস্টটি হালনাগাদ করা হবে।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দৈনিক যুগান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা এবং বায়ান্ন — শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা-২০২৭’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন।


